আমার মা এটাকে পেশা বললেও আমি কিন্তু তা মানতে নারাজ। কারণ ঘুরাঘুরির নেশা আমার খুব ছোট বেলা থেকেই। তাই আমি ঘুরাঘুরিকে পেশার চেয়ে নেশা বলেতই বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কেউ কোথাও বেড়ানোর অথবা ঘুরার কথা বললে সাথে সাথে এক-পা, দু-পা পারলে তিন-পা তুলে রাজি হয়ে যেতাম ছোট বেলা থেকেই। আর এর জন্য আমার আব্বু এবং মা এর কাছে বকা কম শুনতে হয় নি। এমন ও অনেক দিন গেছে ঘুরে আসার পর আমার আব্বু আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিছে। আর আমার মা তার ও একই কথা তোর সাথে কথা বন্ধ। কিন্তু মায়ের মন কি আর পারে ছেলের সাথে কথা বন্ধ করে থাকতে। আমি মাকে বলতাম ঘুরতেই তো গেছি অন্য কোথাও তো যাই নাই। তারপর সব ঠিক হয়ে যেত যদিও আব্বুর রাগটা ভাঙ্গতে একটু সময় লাগতো । আমি ছোট বেলা থেকেই টাকা জমাতাম এবং তার সবটাই খরচ করতাম শুধু ঘুরার জন্য। তবে আমার ঘুরার প্রধান উদ্দেশ্য হলো নতুন নতুন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করা। আমি দেখতে চাই সারা পৃথিবী ঘুরে কিন্তু সবার আগে আমার নিজের দেশটা কে। নিজের দেশটা বুঝতে চাই জানতে চাই দেখতে চাই প্রতিটি অলি গলি।
দেখতে চাওয়ার এ নেশায় প্রতি বছরের শুরুর দিকে অথবা শেষের দিকে অথবা সেমিস্টার ব্রেক এর মাঝখানে ঘুরতে যেতাম দেশের এখান থেকে সেখানে। তেমনি ২০১৪ ও বাদ যায়নি। শুরুতে গাজীপুর এর ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান , নুহাস পল্লী , বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ঘুরলাম। বছরের মাঝামাঝি ঘুরতে গিয়েছিলাম কুমিল্লা জেলায় সেখানে ও ঘুরেছি প্রায় অনেক জায়গায়। আর বছরের শেষটা রেখে দিয়েছিলাম সাগরকন্যার জন্য। ২০১৪ দেখতে দেখেতে বছরটি শেষ হয়ে গেল সাথে শেষ হয়ে গেল ইউনিভার্সিটি জীবনের চারটি বছর ও। তাই বন্ধুরা ঠিক করলাম এবার দেশের দক্ষিণাঞ্চল ঘুরব। প্রথমে ঠিক করলাম খুলনা যাব সুন্দরবন , বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদ ইত্যাদি দেখব। কিন্তু হুট করেই সিধান্ত নিলাম সাগরের অপার মহিমা দেখার। এর আগে আমি এবং আমার বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন কক্সবাজার ঘুরে আসাতে এবার আর সেখানে না যাওয়ার পক্ষেই মত দিল সবাই। কিন্তু সাগর যে আমাদের টানছে তাই টার্গেট ঠিক করলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটা।

চিত্র : কুয়াকাটা বীচ
কিন্তু বাধ সাধল কোন পথে যাব আমরা। ঢাকা থেকে কুয়াকাটা ৩৮০ কিমি। সরাসরি দু ভাবে যাওয়া যায় ঢাকা থেকে সায়দাবাদ অথবা গাবতলী হয়ে সরাসরি বাসে অথবা লঞ্চে করে পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা । আবার বরিশাল হয়েও যাওয়া যায় সেখান থেকে দূরুত্ব ১০৮ কিমি। আমরা বন্ধুরা মোট চার জন যাব ঠিক করলাম। রাজন , রাসেল ,শাওন এবং আমি। আমার ঘুরার সঙ্গী বেশির ভাগ সময় ওরা তিনজন হয়ে থাকে । তার মধ্যে শাওন এর কথা না বললেই নয়। ওকে আমার বন্ধুরা সবাই মামা বলেই ডাকি। যখন ই কোথাও ঘুরার প্লান করি তখনই ওর ওই সমস্যা এই সমস্যা।
সমস্যা ওর লেগেই থাকে তাতে কি আমাদের ঘুরা কিন্তু কোনভাবেই মিস হয় নাহ। তেমনি যাওয়া নিয়ে ও আবার ঝামেলা শুরু করলো। আমরা ঠিক করেছিলাম লঞ্চে যাব আড্ডা , কার্ড খেলা আর লঞ্চের এ ডেক থেকে ও ডেকে ঘুরে সময় ভালোভাবেই পার হয়ে যাবে। সব কিছু ঠিকভাবেই হচ্ছিল কিন্তু মামা যে আমাদের সাথে আছে তাহলে কোনো কিছুই ঠিকভাবে হওয়ার উপায় নেই। ওর একটাই কথা লঞ্চে যাওয়া যাবে নাহ। কি জন্যে , জিজ্ঞাস করাতে হাজারো অজুহাত বের করতে ওর সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। অজুহাত -১: অনেক কুয়াশা লঞ্চে যাওয়াটা বিপদজনক , অজুহাত -২: বাস যাবে প্লেন এর গতিতে সেখানে লঞ্চে যেতে ৬-৭ ঘন্টা দেরী হবে, অজুহাত -৩: লঞ্চের কেবিনে ছাড়পোকা থাকতে পারে তাই রাতে ভালো ঘুম হবে নাহ , অজুহাত -৪: বাসে উঠে চোখ বন্ধ করলেই দেখবি কুয়াকাটা সী-বীচ এর বেঞ্চে শুয়ে আছিস, অজুহাত -৫: আমার আবার ৩-৪ ঘণ্টা পর পর প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে হয় লঞ্চের শব্দে তা পেটের মধ্যে আটকে যাবে পরে আমার ভারে লঞ্চ ডুবে যেতে পারে এইরকম হাজারো সমস্যা।
কি আর করার শেষে একরকম বাধ্য হয়েই রাজি হয়ে গেলাম বাসে যাওয়ার জন্য। এবার টিকেট কাটার পালা , আমি যেতে পারলাম না টিকেট কাটতে কাজ থাকার কারণে। গেল ওরা তিনজন বেচরা তিনজনের অনেক কষ্ট হয়েছে ভালো বাস খুজে পেতে। তাই ওদের তিনজন কে একটু ধন্যবাদ না দিলেই নয়। টিকেট কাটা হলো কুয়াকাটার বিখ্যাত বাস কুয়াকাটা এক্সপ্রেসের। যদিও আমরা শুনেছিলাম সাকুরা বাস নাকি চরম মাত্রায় বিখ্যাত কিন্তু সাকুরা বাস কাউন্টার থেকেই ওদের পাঠানো হয়েছিলো কুয়াকাটা এক্সপ্রেসে। জানিনা কারণটা আসলে কি ছিল। যাক বাস নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ ছিল নাহ। কারণ অন্যদের সাথে কথা বলে জেনেছি সব বাস এর কোয়ালিটি আসলে একই রকম।
যাক এইবার যাওয়ার পালা ২৭ই ডিসেম্বর ২০১৪ সন্ধ্যা ৬ টায় আমাদের বাস। যথারীতি আমি আর রাজন বাস কাউন্টারে এসে হাজির হলাম। ওদের ফোন দেওয়া হলো ওরা ও কাউন্টারে উপস্থিত বাকি রইলো শুধু বাসটাই। আমরা কাউন্টারে পৌছেছিলাম ৩০ মিনিট আগেই। কাউন্টার থেকে বলা হলো অপেক্ষা করেন বাস যথাসময়ে চলে আসবে। এবার অপেক্ষার পালা ৬টা বাজলো কাউন্টার থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো বাস যেখানে এসে থামবে সেখানে। গেলাম আমরা চারজন সাথে বাসের অন্য যাত্রীরা ও। ওইখানে যাওয়ার পর হলো ভিন্ন অভিজ্ঞতা। এতদিন ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় এর কথা শুনেছি আজ শুনছি বাসের সিডিউল বিপর্যয়। কাউন্টারে দাড়িয়ে থাকা এক লোক বলল বাস আসতে দুই ঘণ্টা দেরী হবে। লোকটি বলল ” ভাই আপনাগো লগে মিছা কথা কইয়া লাভ নাই ,বাস দুই ঘন্টার আগে কোনভাবেই আইতে পারব না ,আপনারা বসেন বাস আইয়া পরব নি ” এ কথা শুনে মেজাজটা গেল খারাপ হয়ে। অনেক কষ্টে মেজাজটা ঠান্ডা করলাম ,ওদিক দিয়ে মামু শুরু করলো এইখানে দাড়িয়ে থেকে লাভ নাই আমার বোনের বাসা কাছেই চল সেখানে যাই ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে আসি। কথাটা একেবারে খারাপ বলে নাই।
মো: মাসুদ সরকার
টুরিস্ট ডায়েরি কুয়াকাটা
(চলবে)
“ ঘুরে এলাম কুয়াকাটা “ পর্ব – ২
newssaradin.com/১৬ ডিসেম্বর ২০১৫
